বার্ষিক ৮০ লক্ষ টাকার চাকরি হারিয়ে আত্মহত্যা AI এর কারণে??

3 মিনিটের পড়াস্মৃতিকথা
শেয়ার করুন:
বার্ষিক ৮০ লক্ষ টাকার চাকরি হারিয়ে আত্মহত্যা AI এর কারণে??
0ভিউ
0শেয়ার

সোমবার সকালে তেলঙ্গানার সিদ্দিপেটের বাসিন্দা ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ভানু চন্দর রেড্ডি(৩২) তাঁদের বেঙ্গালুরুর কোথানুর এলাকার ফ্ল্যাটের একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আ। ত্ম। হ। ত্যা করেন। স্ত্রী শাজিয়া সিরাজ(৩১) IBM কর্মী, অফিসে নাইট সিফট করে সকালে বাড়ি ফিরে এই দৃশ্য দেখে ১৭ তলা ফ্ল্যাট থেকে ঝাঁ। প মেরে তৎক্ষণাৎ তিনিও আ। ।ত্ম। ।হ ।ত্যা করেন। দুজনে গোপনে বিয়ে করে সেই সম্পর্ক গোপন রেখে প্রায় আড়াই বছর সংসার করছিলেন। মোটা টাকা ইনকাম করে ভানু চন্দর রেড্ডি আমেরিকায় ও তেলেঙ্গানায় দুখানা বাড়িও কিনে ফেলেছিলেন , কিন্তু হঠাৎই AI এর কারণে চাকরি চলে যায় তার , এরপর বহু চেষ্টা করেও আর কোনো চাকরি পাননি তিনি।


পরিবার ও স্ত্রীর সাপোর্ট থাকা সত্বেও তিনি হতাশায় ভুগছিলেন ও শেষে এই মর্মান্তিক সিদ্ধান্ত নেন। তার এই ভাবে চলে যাওয়া সহ্য করতে পারেননি শাজিয়া, তাই তিনিও একই রাস্তা অবলম্বন করেন।


এই সংবাদকে যদি আমরা কেবল একটি প্রযুক্তিগত দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তবে আমরা মানুষের অন্তর্গত বিপর্যয়কে অপমান করব। এখানে শুধু একটি চাকরি হারানোর কাহিনি নেই; এখানে আছে একটি সমগ্র মধ্যবিত্ত সভ্যতার নীরব ভাঙন। “AI চাকরি কেড়ে নিল”—এই বাক্যটি সত্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য নয়। আরও গভীর, আরও ভয়ংকর সত্য হলো: AI শুধু মানুষের শ্রমকে নয়, মানুষের পেশাগত আত্মপরিচয়কেও অবমূল্যায়ন করছে। যে মানুষটি এতদিন বিশ্বাস করত, তার জ্ঞান, তার কোড, তার বহু বছরের অনুশীলন তাকে সম্মান, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ দেবে—সে হঠাৎ আবিষ্কার করছে, বাজার আর তার দক্ষতাকে আগের মতো দরকার মনে করছে না।


কিন্তু এখানেই দ্বিতীয় ট্র্যাজেডি। আমাদের সমাজ, বিশেষত ভারতীয় মধ্যবিত্ত পরিবার, সন্তানকে শেখায় আনুগত্য, পরিশ্রম, পরীক্ষায় সাফল্য, একটি উচ্চবেতনের চাকরির স্বপ্ন; কিন্তু শেখায় না বাজার কী, মূল্যসৃষ্টি কী, ব্যবসা কী, বিক্রি কী, ঝুঁকি কী, অনিশ্চয়তার সঙ্গে কেমন করে বাঁচতে হয়। ফলে এই শ্রেণির বহু মেধাবী মানুষ জীবনের একটিমাত্র ভাষাই শেখে—চাকরির ভাষা। যতদিন প্রতিষ্ঠান তাকে গ্রহণ করে, সে সম্মানিত; কিন্তু যেই প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে যেন নিজের কাছেই পর হয়ে যায়। তখন তার হাতে ডিগ্রি থাকে, অভিজ্ঞতা থাকে, কখনও বাড়ি-গাড়ি থাকে—কিন্তু থাকে না নতুন বাস্তবতায় সাঁতার কাটার শক্তি। সে জলের মধ্যে, অথচ সাঁতার জানে না।


এবং এই কারণেই “AI রি-স্কিলিং” কথাটিও অনেক সময় অর্ধসত্য। কারণ নতুন টুল শেখা মানেই মুক্তি নয়; টুলও একদিন সস্তা হয়ে যায়, স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, বাজারে তারও দাম পড়ে। আজকের যুগে টিকে থাকবে সে-ই, যে বুঝতে পারবে প্রযুক্তি নিজে গন্তব্য নয়—প্রযুক্তি কেবল ব্যবসায়িক মূল্য তৈরির একটি যন্ত্র। অর্থাৎ, কোড লেখার চেয়ে বড় প্রশ্ন এখন: তুমি কাকে বাঁচাবে, কাকে মুনাফা দেবে, কোন ব্যথা কমাবে, কোন প্রয়োজনে বাজার তোমার দিকে ফিরবে?


এই মৃত্যুসংবাদ তাই আমাদের সামনে এক নির্মম আয়না ধরে। এখানে AI-র নিষ্ঠুরতা যেমন আছে, তেমনি আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার শূন্যতা, মধ্যবিত্ত মানসিকতার ভীরুতা, এবং আত্মমর্যাদাকে কেবল বেতনের অঙ্কে বেঁধে ফেলার অপরাধ।


 ভবিষ্যৎ তাদের নয়, যারা শুধু কাজ করতে পারে; ভবিষ্যৎ তাদের, যারা কাজকে অর্থনৈতিক মূল্য, সম্পর্ক, এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে রূপান্তর করতে জানে। বাকি সবাই—দুঃখজনক হলেও সত্য—একটি ভেঙে পড়া সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে।


লেখার সোর্সঃ Ellicott City, Maryland, USAতে বসবাসরত ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার বিপ্লব পালের প্রোফাইল থেকে নেয়া।

ট্যাগ:

স্মৃতিকথা

এই পোস্ট কি সহায়ক ছিল?

4.5 (23 রেটিং)

আপনার রেটিং:

লেখক সম্পর্কে

মোহাম্মদ শেখ শাহিনুর রহমান

মোহাম্মদ শেখ শাহিনুর রহমান

সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, লেখক এবং সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ

একজন বহুমুখী পেশাদার যিনি প্রযুক্তি এবং সাহিত্যের সমন্বয়ে অনন্য কাজ করছেন। তার লেখায় সমাজ, জীবন এবং মানুষের গভীর অনুভূতি প্রতিফলিত হয়।

মন্তব্য (0)

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!